শক্তিশালী কর্মী সম্পর্ক গড়ে তোলার কিছু কৌশল

লেখক: মোঃ নুর-ই-আলম, হেড অব এইচ.আর এ্যাডমিন এন্ড কমপ্লায়েন্স, এসএম গ্রুপ।

যে কোন প্রতিষ্ঠানে কার্যকরী কর্মী সম্পর্ক একটি ইতিবাচক কর্ম পরিবেশ তৈরি করার জন্য, কর্মচারীদের সন্তুষ্টি বাড়ানোর জন্য এবং উত্পাদনশীলতার বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। এখানে কিছু মূল হাতিয়ার এবং কৌশল রয়েছে যা শক্তিশালী কর্মচারী সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যবহার করা যেতে পারে:

১) কার্যকরী যোগাযোগ

যে কোন প্রতিষ্ঠানে কর্মী সম্পর্ক গাঢ় করতে কর্মীদের সাথে কার্যকরী যোগাযোগ রক্ষা করা অতীব জরুরী। যেমন-

নিয়মিত মিটিং: কর্মীদের অবগত ও নিযুক্ত রাখতে নিয়মিত টিম মিটিং করুন, কর্মীদের কার কি সমস্যা রয়েছে তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন।

ইন্ট্রানেট এবং নিউজলেটার: গুরুত্বপূর্ণ আপডেট, কোম্পানির খবর এবং কর্মচারীদের অর্জন শেয়ার করতে একটি ইন্ট্রানেট সিস্টেম বা নিয়মিত নিউজলেটার ব্যবহার করুন।

পরামর্শ বক্স: কর্মীদের বেনামে তাদের ধারনা এবং প্রতিক্রিয়া শেয়ার করার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম প্রদান করুন। যেখানে তারা স্বাধীনভাবে তাদের মতামত, পরামর্শ নিদ্বিধায় শেয়ার করতে পারেন। নিয়মিত পরামর্শ বক্স খুলুন এবং পরামর্শগুলো আমলে নিন সে মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করুন।

সমীক্ষা এবং প্রতিক্রিয়া ফর্ম: কর্মীদের অনুভূতি এবং উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি বোঝার জন্য নিয়মিত সমীক্ষা এবং প্রতিক্রিয়া সেশন পরিচালনা করুন। সমীক্ষার ফলাফল ভালোভাবে বিশ্লেষণ করুন এবং সে মোতাবেক কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করুন।

২) কর্মী স্বীকৃতি এবং পুরস্কার এর ব্যবস্থা করুন

বেস্ট কর্মী বাছাইকরণ প্রোগ্রাম: ব্যতিক্রমী কর্মক্ষমতা এবং অবদানের জন্য কর্মীদের স্বীকৃতি দিন এবং পুরস্কৃত করুন। প্রতি মাসে বেস্ট কর্মী বাছাইকরণ প্রোগ্রাম রাখতে পারেন, সেখানে স্বল্প কিছু পুরস্কার বা একটি সনদ আপনার সেই কর্মীকে অনুপ্রাণিত করবে এবং তার কাছ থেকে আপনি সর্বাধিক কাজের আউটপুট পাবেন।

পারফরম্যান্স বোনাস এবং ইনসেনটিভ প্রোগ্রাম: নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা মাইলফলক অর্জনের জন্য কর্মীদেরকে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করার ব্যবস্থা করুন। দেখবেন বিষয়টি ম্যাজিকের মতো কাজ করছে।

আর্থিক পুরষ্কার: মাঝে মাঝে অ-আর্থিক পুরস্কার কর্মীদেরকে অনুপ্রাণিত করে। যেমন: কর্মীদেরকে তাদের ভালো পারফরম্যান্সের জন্য মিটিং বা ইভেন্টের সময় সার্টিফিকেট, ফলক, বা সর্বজনীন স্বীকৃতি প্রদান করতে পারেন।

৩) পেশাগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা করুন

প্রশিক্ষণ এবং উন্নয়ন কর্মসূচী: কর্মচারীদের তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তাদের কর্মজীবনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আভ্যন্তরীন কিংবা বাহ্যিক প্রশিক্ষনের সুযোগ করে দিন। এতে করে তাদের একদিকে যেমন পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে তেমনি অন্যদিকে আপনার প্রতিষ্ঠানেও উক্ত কর্মী কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।

মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম: কর্মচারীদের তাদের পেশাগত বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য পরামর্শদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন, প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানে মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে পারেন। এতে দুর্বল কর্মীগণ তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিকাশের সুযোগ পাবেন।

পেশাগত উন্নয়ন পরিকল্পনা: অনেক সময় দেখা যায় যে ভালো কর্মীগণ প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যায় শুধুমাত্র তাদের ক্যারিয়ার উন্নয়ন পথনির্দেশনা না থাকার কারণে। তাই কর্মীদের জন্য একটি স্পষ্ট ক্যারিয়ার উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করুন এবং তার বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করুন দেখবেন আপনার প্রতিষ্ঠানে মাইগ্রেশনের হার কমে গেছে।

৪) দ্বন্দ্ব সমাধানের জন্য সঠিক পদক্ষেপ গ্রহন করুন

মধ্যস্থতা পরিষেবা: কর্মীদের মধ্যে এবং ব্যবস্থাপনার মধ্যে দ্বন্দ্ব সমাধানের জন্য মধ্যস্থতা করে দ্বন্দ্ব সমাধানের জন্য সঠিক পদক্ষেপ গ্রহন করুন। মধ্যস্থতা করার সময় উভয়পক্ষ যাতে লাভবান হতে পারেন সেদিকে গুরুত্ব দিয়ে সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্যেগ গ্রহন করা উচিত।

অভিযোগের ব্যবস্থাপনা: প্রতিষ্ঠানে কর্মী সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কার্যকরী অভিযোগ ব্যবস্থাপনা থাকা অপরিহার্য। কার্যকরী অভিযোগ ব্যবস্থাপনা থাকলে কর্মীরা তাদের অনুযোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নিকট তুলে ধরতে পারেন এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যদি সমস্যার সমাধান করতে পারলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতি কর্মীদের আস্থা অনেকগুন বেড়ে যায় ফলে কর্মী সম্পর্ক দৃঢ় হয়।

খোলা দরজা নীতি: প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই যে কোন অভিযোগ/ অনুযোগ নিয়ে ব্যবস্থাপনার কাছে যেতে কর্মীদের উৎসাহিত করুন। যাতে তারা বিনা বাধায় তাদের যে কোন অভিযোগ বা পরামর্শ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে জানাইতে পারে।

৫) স্বাস্থ্য এবং সুস্থতা কর্মসূচী

কর্মচারী সহায়তা কর্মসূচী (EAPs): কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করুন। মানসিকভাবে অসুস্থ কর্মী কখনই প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো আউটপুট দিতে পারেন না। তাই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই কর্মীদের মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচী চালু করা উচিত।

সুস্থতা কর্মসূচী: শারীরিক ফিটনেস প্রোগ্রাম, স্বাস্থ্য স্ক্রীনিং এবং ইত্যাদির মাধ্যমে কর্মীদের শারীরিক স্বাস্থ্যে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা করুন। মনে রাখতে হবে সুস্থ কর্মী মানেই সুখী কর্মী আর সুখী কর্মী উৎপাদনের অন্যতম নিয়ামক।

ওয়ার্কলাইফ ব্যালেন্স ইনিশিয়েটিভস: প্রতিষ্ঠানে কর্মী সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কাজ এবং জীবন এর মধ্যে ভারসাম্য নীতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য কর্মীদেরকে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করুন। যেমন-কাজের সময় নমনীয় করা, ছুটি প্রদান করা, জরুরী প্রয়োজনে স্বল্পকালীণ ছুটির ব্যবস্থা করা, মহিলাদের রাত্রীকালীণ কাজ না দেওয়া, দূরবর্তী কর্মীদেরকে যানবাহনের ব্যবস্থা করা ইত্যাদির মাধ্যমে কাজ এবং জীবন এর মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা যায়।


৬) কর্মী সম্পৃক্ত করণ কর্মসূচী

টিম বিল্ডিং কার্যক্রম: কর্মীদের জন্য বিভিন্ন টিম বিল্ডিং কর্মসূচীর আয়োজন করুন যা আপনার টিম স্পিরিট বাড়িয়ে দিবে এবং আপনার টিম উৎসাহ নিয়ে কাজ করবে।

সামাজিক ইভেন্ট: কর্মীদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক ইভেন্ট এর আয়োজন করুন। এতে কর্মীদের মধ্য যোগাযোগ বৃদ্ধি পায় এবং নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে। যেমন-বিভিন্ন বিষয় সেলিব্রেট করা, আউটডোর পার্টির আয়োজন করা ইত্যাদি।

স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে উৎসাহ প্রদান: কর্মচারীদের কমিউনিটি সেবা এবং কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার উদ্যোগে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করুন। এতে কর্মীগণ সমাজের জন্য ভালো কিছু করার অংশীদার হিসেবে নিজেকে গর্বিত মনে করতে পারেন।

৭) পারফরমেন্স ম্যানেজমেন্ট

নিয়মিত কর্মক্ষমতা পর্যালোচনা: কর্মীদের সাথে তাদের কাজের পারফরমেন্স নিয়ে বৎসরে অন্তত দুইবার খোলা-মেলা আলোচনা করার ব্যবস্থা করুন, কোন কোন বিষয়ে তার পারফরমেন্স খারাপ তা তাকে বুঝিয়ে দিন এবং পারফরমেন্স ভালো করার জন্য প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করুন । কাজের লক্ষ্যমাত্রা সেট করে দিন এবং লক্ষ্য অর্জনে করনীয় সর্ম্পকে তাকে পরামর্শ প্রদান করুন।

সঠিক ফিডব্যাক প্রদান: কর্মীদের সাথে তাদের কাজের পারফরমেন্স সর্ম্পকিত সঠিক ফিডব্যাক প্রদান করুন। যাতে কর্মীগণ সচেতন হতে পারেন ও তার নিজের দুর্বল দিকগুলোকে আমলে নিয়ে ভবিষ্যত এ ভালো করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করতে পারেন।

পারফরমেন্স মেট্রিক্স: কর্মীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং পুরস্কৃত করতে পরিষ্কার এবং পরিমাপযোগ্য কর্মক্ষমতা সূচক ব্যবহার করুন। অবশ্যই যাতে পারফরমেন্স মেট্রিক্সগুলো স্মার্ট হয় অর্থাৎ মেট্রিক্সগুলো পরিমাপযোগ্য, সময়ানুযায়ী অর্জনের যোগ্য, সুনির্দিষ্ট, নির্ভরযোগ্য হয় সেদিক খেয়াল রেখে পারফরমেন্স মেট্রিক্সগুলো নির্ধারণ করতে হবে।

৮) কর্মীদেরকে নতুন নতুন কাজ ও ইনোভেটিভ/ ক্রিয়েটিভ কাজে সর্ম্পৃক্ত করণ

প্রতিভাবান কর্মী নির্বাচন: কর্মক্ষেত্রে প্রতিভাবান কর্মী নির্বাচন করুন। তাদেরকে বিভিন্ন নতুন নতুন কাজ,ইনোভেটিভ/ ক্রিয়েটিভ কাজ এবং চ্যালেঞ্জিং কাজে সর্ম্পৃক্ত করুন এতে করে তারা কাজের একঘেয়েমী থেকে বেড়িয়ে আসবেন এবং নতুন উদ্যেমে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করবেন।

ফোকাস গ্রুপ: কর্মক্ষেত্রের সমস্যা বা উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করা এবং প্রয়োজনীয় ইনপুট প্রদানের জন্য কর্মীদের ছোট ছোট দল সংগ্রহ করুন। তাদেরকে বিভিন্ন দায়িত্ব দিন যাতে তারা নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারেন। অনেকক্ষেত্রেই এই ছোট ছোট দলের ভূমিকা অনস্বীকার্য হিসেবে দেখা যায়।

কর্মী জরিপ: কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তাদের মতামত সংগ্রহ করতে নিয়মিতভাবে কর্মীদের জরিপ পরিচালনা করুন। এতে করে প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ও লুকানো বিভিন্ন সমস্যা উঠে আসবে যা থেকে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রিভেন্টিভ এ্যাকশন গ্রহন করতে পারেন।

৯) বৈচিত্র্য এবং সকল ধরনের কর্মীর অন্তর্ভুক্তি উদ্যোগ

বৈচিত্র্য প্রশিক্ষণ: কর্মীদেরকে বৈচিত্র্য, সমতা এবং ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ইত্যাদি নির্বিশেষে সকলকে সমান সুযোগ সুবিধা প্রদান, প্রশিক্ষণে সকলের সমান অংশগ্রহন, অবৈষম্য ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করুন।

অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি: প্রতিষ্ঠানে এমন একটি নীতি প্রচার করুন যেখানে সবাইকে সমান চোখে দেখা হয় এবং কারো প্রতি কোন ধরনের বৈষম্য করা হয় না। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ইত্যাদি নির্বিশেষে সকলে্ই কাজ করার অধিকার ভোগ করে এবং সকলক্ষেত্রে সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন।

১০) প্রযুক্তি এবং অটোমেশন টুল্স

এইচআর ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এইচআরএমএস): কর্মীদের রেকর্ড, সুবিধা এবং বেতন দক্ষতার সাথে পরিচালনা করতে HRIMS সফ্টওয়্যার ব্যবহার করুন।

কর্মচারী স্বপরিষেবা পোর্টাল: কর্মচারীদের তাদের নিজস্ব এইচআর-সম্পর্কিত তথ্য অ্যাক্সেস এবং পরিচালনা করার অনুমতি দিন। যেমন তারা নিজেরা নিজেদের ছুটির আবেদন করতে পারবেন, ছুটি অনুমোদন হয়েগেলে তাদের মোবাইল ডিভাইসে অনুমোদনের নোটিফিকেশন পৌছে যাবে। এতে তাদের সময় নষ্ট হবে কম এবং কর্মজীবন সহজতর হবে।

যোগাযোগের মাধ্যম: যোগাযোগ এবং দলগত কাজকে সহজতর করতে মাইক্রোসফ্ট টিম বা জুমের মতো এ্যাপস গুলি প্রয়োগ করতে উৎসাহিত করুন এবং তাদেরকে উক্ত বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তুলুন।

উপরোক্ত বিষয়গুলির কার্যকরী প্রয়োগের মাধ্যমে যে কোন প্রতিষ্ঠানে কর্মী সম্পর্ককে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে যা কর্মীদেরকে কাজের সাথে অধিকতর সংযুক্তকরণ, কর্মে সন্তুষ্টি অর্জনে এবং উৎপাদশীল কর্মী বাহিনী হিসেবে নিজেদেরকে প্রকাশ করতে পারবেন।

Leave a Reply